হলুদ সাংবাদিকতা ও হলুদের রাজনীতি!

NewsBarisal.com

প্রকাশ : জুলাই ১৭, ২০২০, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

এম.কে. রানা ।।

যেকোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে রাজনীতি থাকবে, রাজনৈতিক দল থাকবে, রাজনীতির চর্চা থাকবে, তার অনুশীলন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টা অনেকটা অস্বাভাবিক হয়ে যায় তখনই, যখন রাজনৈতিক চরিত্র স্খলনজনিত ক্রিয়াকলাপ পরিলক্ষিত হয়। অপরদিকে স্বাধীন দেশে সংবাদ মাধ্যম থাকবে। সমাজে নানাবিধ অসংগতি এবং রাষ্ট্রের কল্যাণকর কর্মকাণ্ডের কথা সংবাদ মাধ্যমে লেখা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অপসাংবাদিকতা যখন গ্রাস করে বসে তখন হুমকির মুখে পড়ে সংবাদ মাধ্যম। রাজনীতি আর সাংবাদিকতা বিষয়ে আজকে লিখতে হচ্ছে এ কারণেই যে, আজকাল হলুদ/অপ সাংবাদিকতা যেমন দেখা যায়, তেমনি রাজনৈতিক যোগ্যতা না থাকা ব্যক্তিদের রাজনীতিতে সক্রিয় দেখে বলতে হয় হলুদ/অপ রাজনীতি এদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অপসাংবাদিকতা/হলুদ সাংবাদিকতা রুখতে যেমন একের পর এক আইন প্রণীত হচ্ছে, তেমনি অপ রাজনীতি/হলুদ রাজনীতি বন্ধেও আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। কেননা রাজনীতিতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ছে। আর ত্যাগী নেতাকর্মীরা হয়ে পড়ছে কোনঠাসা।

রাজনীতি ও সাংবাদিকতা যখন অস্ত্র বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের মন, মানসিকতা ও সমাজ ব্যবস্থার উপর। সা¤প্রতিক সময়ে রাজনীতি ও সাংবাদিকতার আড়ালে কেবল দুর্নীতিই নয়, ক্ষমতা আর সম্পদ আহরণই যেন নেশা পেশায় পরিণত হয়েছে। এটা রাজনীতি ও সাংবাদিকতা পেশার জন্য অশনি সংকেত। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নইলে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে বাবর (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), জি.কে. শামীম, সম্রাট, সাহেদ, সাবরিনার মতো প্রতারকদের সংখ্যা। যেমনটি ৯০ দশকে ছিল টাইগার বাবুল, এরশাদ সিকদার, গিয়াল আল মামুন এর মতো মাফিয়া ডন। অবশ্য তাদের অস্তিত্ব এখন আর নেই। তবে নিত্য নতুন মাফিয়া প্রতারকদের সৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য দায়ী কারা। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় সা¤প্রতিক সময়ে যারা অনুপ্রবেশকারী ও প্রতারণার মাধ্যমে হয়ে উঠছে প্রভাবশালী ব্যাক্তি তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতাবান হয়েছেন।

সাংবাদিকতা হল বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, ও মানুষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন, যা উক্ত দিনের প্রধান সংবাদ এবং তা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। আর রাজনীতি হলো হল দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থ ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের সমষ্টি।

দেশ যেমন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তেমনি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ থেকে মাত্র ১০ বছর পেছনে তাকালে দেখা যায় সারাদেশে পত্রিকার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে স্থানীয় ও অনলাইন পত্রিকা। সাথে সাথে বাড়ছে সাংবাদিকের সংখ্যাও। ইচ্ছে করলেই যে কেউ যে কোন যোগ্যতা নিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। সংবাদের মান যাই হোক মানের বিচার না করে অনায়াসেই সাংবাদিকতার খাতায় নাম লিখিয়ে অপসাংবাদিকতা (হলুদ সাংবাদিকতা) করছেন কেউ কেউ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউবা আবার অপকর্ম, অন্যায় ঢাকতে, নিজের পরিচিতি বাড়াতে, সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পত্রিকা ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া নেতাদের শেল্টার দিচ্ছেন ওই সকল পত্রিকার মালিকগণ। যেমনটি খোঁজ মিলেছে করোনাকালীন প্রতারণার গডফাদার হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সাহেদ করিমের বেলায়। তিনি তার ক্ষমতার ব্যাপ্তি আর অসৎ কর্মকাণ্ড ঢাকতে একটি পত্রিকার প্রকাশক হয়েছিলেন।

একইভাবে হাল জমানায় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীও বাড়ছে। এদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত রাজনীতির ব্যানারে থাকলে (বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের) অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। আর এই সুবিধাই এক সময় সাধারণ মানুষের অসুবিধার কারণ হয়ে দাড়ায়। যেমনটি লক্ষ্য করা যায়, সা¤প্রতিক সময়ে আলোচিত ক্যাসিনো ও সর্বশেষ মহামারী করোনাকালীন অভিযানে। যারা আসলে ভুইফোঁড় বা অনুপ্রবেশকারী হয়ে দলে ঢুকে দলের ব্যানার ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ তথা রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। করোনা’র ভুয়া রিপোর্টদানকারী সাহেদ আটক হওয়ার পর দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। এতে বিভ্রান্ত হচ্ছে দেশের মানুষ। রাজনৈতিক দলদুটি শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যারা দলের দুর্দিনে রাজপথে লড়াই করেছেন তারা এখন অনুপ্রবেশকারীদের দাপটের কাছে অসহায়। অন্তত বিগত দুই দশকে বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলে এ ঘটনা অহরহ।

অপরদিকে, আমাদের দেশে সব সাংবাদিক যে সাংবাদিকতা বিষয়ে অনার্স/মাস্টার্স করে সাংবাদিকতায় আসছেন তা কিন্তু নয়। বরং বলা যায় এসএসসি কিংবা নাইন-টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেই কোন না কোনভাবে সাংবাদিকতা পেশায় নাম লিখিয়েছেন। ফলশ্র“তিতে অনেক সংবাদ মাধ্যম ও সেখানে নিয়োজিত সাংবাদিকদের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুরূপভাবে আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক নেতা কিন্তু ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে উঠে আসেনি। বরং বর্তমান সময়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ী, আমলা, সরকারের পদস্থ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ রাজনীতির সাথে যুক্ত হচ্ছেন। আর রাজনৈতিক দলগুলোও সাংবাদিকদের মতো কোন ধরণের যাচাই বাছাই না করেই তাদেরকে দলে ঠাঁই দিচ্ছেন। এমনকি কোন ধরণের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও দলের বড় ভাইদের হাত ধরে মিছিল মিটিংয়ে লোক জড়ো করেই নেতা বনে যাচ্ছেন কেউ কেউ। কেউবা আবার মোটা অংকের অর্থ ঢেলে বাগিয়ে নিচ্ছেন দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ। আর এ শ্রেনীর নেতারাই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। ইমেজ সংকটে পড়তে হচ্ছে দলের নীতি নির্ধারকদের।

এদিকে দেখা যায়, সংবাদপত্রের মালিক পক্ষের দেয়া আইডি কার্ড (পরিচয়পত্র) ব্যবহার করে নানাবিধ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন হলুদ সাংবাদিকরা। আর তা যখন প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ে তখন মালিক পক্ষের সোজা সাপটা জবাব, ‘এক সময় আমার পত্রিকায় ছিল, তবে স্বভাব চরিত্র ভাল নয় বলে তাকে আমরা অনেক আগেই বাদ দিয়েছি’। আমরা লক্ষ্য করছি, সা¤প্রতিক সময়ে সরকারের নানাবিধ অভিযানে আওয়ামীলীগের সাইনবোর্ডধারী কতিপয় প্রতারক প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া যাচ্ছে। আর রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা পত্রিকার মালিক পক্ষের মতো একই সুরে বলে থাকেন, সে (প্রতারক) আমাদের দলের কেউ না।

অপসাংবাদিকতা রুখতে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে। ওই আইনের সবচেয়ে লক্ষণীয় ধারাটি সম্ভবত ৩২, যেখানে কম্পিউটার বা ডিজিটাল মাধ্যমে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ বলে বিবেচিত হবে, এমন অপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ এবং এই অপরাধের সর্বোচ্চ দণ্ড ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

গত এক দশকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ দেশের অভূতপূর্ব অর্জনের বিষয়টি দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কিন্তু আমাদের সমাজে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম এতটাই বিস্তৃত হয়ে উঠেছে যে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক সুফল সাধারণ মানুষ কতটা ভোগ করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ তৈরি হতে থাকে। কেননা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অরাজনৈতিক, দুর্নীতিপরায়ণ, নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এতটাই ঘটেছে যে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে আদর্শের রাজনীতি এখন অনেকটাই যেন কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

আমরা লক্ষ্য করছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে প্রথমেই নিজ দলের ভেতর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। যা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে বলে মনে করি। কেননা নিজ ঘর আগে শুদ্ধ হলেই কেবল অপর ঘরে শুদ্ধি অভিযান চালানো যায়। আওয়ামীলীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিজ দলের ভেতর থেকে দুর্নীতি হঠাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তাতে দলের ভেতরকার অনুপ্রবেশকারী বা হঠকারী বা ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিরা আগে ভাগেই সটকে পড়বেন। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগকে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা সব সময় সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত রয়েছে জানিয়েছেন তিনি।

সচেতন মহল মনে করেন, হলুদ সাংবাদিকতার মতোই রাজনীতিতে হলুদের আগ্রাসন শুরু হয়েছে। এদেরকে শুরুতেই দমানোর তাগিদ দিয়ে তারা বলেন, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা এ ব্যাপারটি সঠিকভাবে অনুধাবন করলে দেশ ও দেশের মানুষ অপরাজনীতির কবল ও প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে রাজনীতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে এবং নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুস্থ রাজনীতি চর্চায় উৎসাহিত হবে। (চলবে …)

 



সর্বশেষ সংবাদ
কত বছর গত হলে মিলবে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণট্রাষ্টের ভাতা : অধ্যক্ষ তাইজুল ইসলাম চকবাজারের ঝুকিপূর্ন ভবনটির কারনে চরম ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঝালকাঠীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১৪ দোকান ভস্মিভূত, অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি, আহত ১০ মুলাদীতে সাপের কামড়ে গৃহকর্তার মৃত্যু উজিরপুরে মৃত্যুর ১১ বছর পরে ভূয়া দলিল দেখিয়ে জমি দখলের চেষ্টা বরিশালে নতুন ২৭ জনসহ করোনায় মোট আক্রান্ত ২৫২৪ জন, সুস্থ হয়েছেন ১৬৬৭ মুলাদীতে পেয়ারা বিক্রী করেতে এসে ব্রজপাতে ব্যবসায়ী নিহত পটুয়াখালীতে পানিতে ডুবে তিন বোনের মৃত্যু মেহেন্দিগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে গণধর্ষন, অতপর অন্তঃসত্ত্বা মুলাদীতে পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে হামলা, পানিতে চুপিয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ