করোনাঃ অকুতোভয় যোদ্ধা, স্যালুট তোমাদের

NewsBarisal.com

প্রকাশ : এপ্রিল ২২, ২০২০, ১১:৪২ অপরাহ্ণ

এম.কে. রানা : চীনের উহান প্রদেশ থেখে বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাসে গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়। অনেকটা দেরীতে হলেও বাংলাদেশ সরকার দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। সমগ্র দেশ এখন লকডাউনের আওতায়। করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বেশিরভাগ সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ। তবে জরুরী সেবার আওতায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মেলেনি দেশের চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), বিদ্যুৎ বিভাগ, গণমাধ্যম কর্মী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস, ওয়াসা ছাড়াও নগর পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্ন কর্মীদের। মহামারী করোনা ভাইরাসকে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইতিমধ্যে এসকল বিভাগের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। তবুও পিছপা না হয়ে অদৃশ্য শত্রু করোনা উপেক্ষা করে যারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সেই সকল অকুতোভয় যোদ্ধাদের জানাই ‘স্যালুট’।

চিকিৎসক ও নার্সঃ
জীবন বাজি রেখে করোনাযুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে তাদের প্রয়োজনমতো সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হচ্ছে না। যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের চিকিৎসা ও সেবা দিতে হচ্ছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত একজন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়েই সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনউদ্দিন করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। উন্নত চিকিৎসায় ঢাকা আনার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েও তার জন্য পাওয়া যায়নি। এখনও হাসপাতালগুলোতে যারা সরাসরি চিকিৎসাসেবায় যুক্ত তাদের উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেয়া হচ্ছে না।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের চিকিৎসা করতে গিয়ে সারাদেশে ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারী আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, এ পর্যন্ত ১৫০ জন ডাক্তার ও ১৭০ জন নার্স ও কর্মচারী আক্রান্ত হয়েছে (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর)। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিতে খোদ প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিভাগকে আরো সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন। তবে দেশের এই ক্রান্তিকালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের অতুলনীয় সেবা বাংলাদেশ চিরকাল স্মরণ রাখবে।

বাংলাদেশ পুলিশঃ
মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কাজ করছেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীা প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার সদস্য। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের যেতে হচ্ছে নানা জায়গায়। মিশতে হচ্ছে নানান মানুষের সঙ্গে। আর এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দিনভর মাঠে দায়িত্ব পালন শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের পরিবারের কাছে যান। এতে করে তাদের পরিবারের সদস্যরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে মনে করেন তারা। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার বিষয়ে সরাসরি গণমাধ্যমের সাথে কেউ কথা বলতে না চাইলেও তাদের দাবী পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত। প্রয়োজনে তাদের সংশি¬ষ্ট থানা এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশনা দেওয়া উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা মাঠে কাজ করি। মানুষের কাছে যেতে হয় আমাদের। নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও আমাদের যেতে হয়। এটাই আমাদের দায়িত্ব। তবুও আমরা চেষ্টা করছি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে।
ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অ লে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের স্বজনরা যখন লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে গেছেন তখন এই পুলিশ সদস্যরাই সেই লাশ দাফনের সকল কাজ সম্পন্ন করছেন। আবার নিজেদের রেশনের একটি বড় অংশ গোপনে দরিদ্রদের মাঝে বিলি করছেন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান (বিপিএম-বার) বলেন, প্রত্যেক পেশাতেই কর্মজীবীদের নানা রকমের চাপ, সমস্যা ও সংকট মোকাবেলা করতে হয়। পুলিশকেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু রাখতে বিশেষ করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করতে হয়। করোনা মোকাবেলায় পুলিশকে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে যার প্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মাবলী অনুসরণ করা সম্ভব হয়। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের পারস্প্ররিক দূরত্ব ও জনগণ থেকে পুলিশের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পুলিশিং করতে হবে। তাছাড়া সব পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীঃ
দেশের ৬২ জেলায় করোনা মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সারা দেশে চলছে সশস্ত্র বাহিনীর এই কার্যক্রম। তারা জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থান করে ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে করোনার বিরুদ্ধে সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি ‘সামাজিক দূরত্ব’ সৃষ্টিতে সহায়তা করে আসছে। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় জীবাণুনাশক পানি স্প্র্রে, বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাপনা তৈরি কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এছাড়ায় উপকূলীয় এলাকায় টহল জোরদার, জীবাণুনাশক স্প্র্রে ব্যবহার ও দুঃস্থদের ত্রাণ বিতরণ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। একইভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের ঘাঁটির নিকটবর্তী স্থানগুলোতে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরী পরিবহন কাজে নিয়োজিত। এছাড়া দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করে আসছে।

বিদ্যুৎ বিভাগঃ
করোনার কারণে দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমেছে। তবে গৃহস্থালী কাজে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সারা দিনরাত চলছে কত ধরনের বিদ্যুৎচালিত সরঞ্জাম। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে তৎপর রয়েছে বিদ্যুত বিভাগের সদস্যরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, স ালন ও কোটি কোটি প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে বিতরণ এক দুরূহ কাজ। উৎপাদন কেন্দ্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে, ট্রান্সমিশন লাইন বিকল হতে পারে এবং সেটা ঘটেও। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বিদ্যুতের কোথাও কোন লোডসেডিং বা দুর্ভোগের খবর পাওয়া যায়নি। এটা সম্ভব হচ্ছে একদল নিবেদিত কর্মীর কারণে। অথচ যারা করোনার প্রচ- ঝুঁকির মধ্যেও দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন করোনা মোকাবিলায় তাদেও জন্য নেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনার তালিকায় বিদ্যুৎ বিভাগ নেই। অথচ সারা দেশে করোনা যদি মহামারী আকারও ধারণ করে তবুও মাঠে থেকে কাজ করতে হবে তাদের এমনটিই জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্যুৎ কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন, আমাদের পরিবারের লোকজনও আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত।

গণমাধ্যম কর্মীঃ
করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সম্মুখ যোদ্ধাদের তালিকায় রয়েছে গণমাধ্যম কর্মীরাও। এই মহামারী ঘিরে কেউ যেন কোন ধরণের গুজব সৃষ্টি করতে না পারে এবং করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করায় গণমাধ্যম কর্মীদের ভুমিকা অপরিসীম। তারা চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। এ পেশার প্রত্যেকেই জানেন, কী ঝুঁকি নিয়ে তারা প্রতিদিন ঘরের বাইরে পা রাখেন। তবে গুটি কয়েক মিডিয়া (ইলেট্রনিক ও প্রিন্ট) কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় কিছুটা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঢাল-তলোয়ারহীন রয়েছেন রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম কর্মীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই জানিয়েছেন প্রায় দুই মাস হতে চলছে অনেক সাংবাদিকই তাদের প্রাপ্য সম্মানীভাতা পর্যন্ত পাননি। এদিকে টেলিভিশনে একজন কর্মীর করোনা ধরা পড়া মাত্রই তার সংস্প্রর্শে যারা এসেছে সকলকে ‘গৃহবন্দি’ করা হয়। পত্রিকার কর্মীদেরও একই সমস্যা। কিন্তু দায়িত্ব ছেড়ে পালাচ্ছে না কেউ। বরং কর্মহীন মানুষ বিশেষ করে ছিন্নমূল পথশিশুদের মুখে অন্ন তুলে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন সারা দেশের অংসখ্য গণমাধ্যম কর্মী।

পরিচ্ছন কর্মীঃ
করোনায় দেশ অচল হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ভালোভাবে চলছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ময়লা তুলে নিয়ে যারা আমাদের নগরকে রাখেন পরিচ্ছন্ন সেই সকল নিবেদিত কর্মীদের সাথে আলাপ হলে তারা বলেন, শহরে হাসপাতাল-ক্লিনিকের প্রচুর বর্জ্য অপসারণ করছেন তারা। এর মধ্যে করোনা রোগী কিংবা তাদের সংস্প্রর্শে যাওয়া চিকিৎসক ও নার্সের ব্যবহৃত বর্জ্য যে নেই, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

অকুতোভয় যোদ্ধাদের সন্তানদের কথাঃ
বর্তমান মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে যে সকল যোদ্ধারা সম্মুখভাগে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন সেই সকল যোদ্ধাদের কোমলমতি সন্তানদের দেয়া পোস্ট বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে দেখা যায়। যেখানে কারো সন্তান তার মা-বাবাকে দৃষ্টান্ত রেখে (ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, বিদ্যুৎ কর্মী, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য) সাধারণ মানুষের প্রতি ঘরে থাকার আহবান জানাচ্ছে। এও দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত মা তার আদরের সন্তানকে হাসপাতালের সামনে দাড়িয়ে দেখছে আর কান্না করছে। সেনা সদস্য তার সন্তানকে পলিথিনে মুড়িয়ে আদর করছে।

অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে যারা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার কাজে নিবেদিত, আমরা তাদের অবদান কোনোদিন ভুলব না। করোনা ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানবসেবায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে একটিই বাক্য আর তা হলো ‘স্যালুট তোমাদের’।

 



সর্বশেষ সংবাদ