ভাষা আন্দোলনে বরিশাল

NewsBarisal.com

প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০, ৭:০১ অপরাহ্ণ

বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতাভিত্তিক জাতিসত্তার উদ্ভব এবং উন্নয়নে বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলন যে বিশাল ভুমিকা পালন করেছে তা যে পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্যদৃষ্টান্ত তা বললে অত্যুক্তি হবে না। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আঞ্চলিকতার গ-ী পেরিয়ে পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাঙালি মানসে যে চৈতন্যের সৃষ্টি করে তা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিলো স্বাধিকার আন্দোলনে। আমরা পেয়েছি স্বাধীনতার স্বর্গসুখ। ঢাকার রাজপথে ঝরা তরুণদের তাজা রক্তের উষ্ণতায় তৎকালীন বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চল অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়ে উঠেছিলো। আন্দোলনের ঢেউয়ের তোড় অন্যস্থানের মতো বরিশালকেও আন্দোলিত করেছিলে দারুণভাবে। এ কারণেই ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাসে বরিশালের তরুণসমাজ জেগে উঠেছিলো প্রচ-ভাবে।
বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম কবীর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার উপর এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন ১৯৪৭ সালের শেষভাগে। সভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য রাখেন অ্যাড. অবনী ঘোষ, অ্যাড. মোবারক আলী, রফিকুল ইসলাম, বি.এম. কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ডি.এন চ্যাটার্জি। পক্ষান্তরে উর্দুভাষার সমর্থনে বক্তৃতা দেন জেলা মুসলিম লীগ সভাপতি আজিজউদ্দীন ও সাহিত্যিক সাংবাদিক মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী। তবে-এ আলোচনায় সব বক্তাই বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন।

১৯৪৮ সালে বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। ওইবছর ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রশীদ বিল্ডিং-এ এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় ফজলুল হক হলের ছাত্র ভোলার শামসুল আলমকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক করা হয়। সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন বরিশালের আবদুর রহমান চৌধুরী (বিচারপতি) তিনি তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহ-সভাপতি ছিলেন। একই দিনে বরিশাল মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক জনসভার আয়োজন করে মুসলিম ছাত্রলীগ। ছদরুদ্দিনের সভাপতিত্বে এ সভায় বক্তব্য রাখেন আখতারুদ্দিন আহমদ, এম ডব্লিউ লকিতুল্লাহ, অনিল দাস চৌধুরী। সন্ধ্যায় এক শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ করে। বি.এম. কলেজেও ওইদিন ছাত্রদের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা হয়। অশ্বিনী কুমার হলে আর একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন হাশেম আলী। সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবি করা হয়।

১৯৪৮ সালে ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয় এবং সচিবালয় ঘেরাও করা হয়। পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বরিশালের কাজী গোলাম মাহবুব ও সরদার ফজলুল করিমকে (অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) গ্রেফতার করে। ঢাকার সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ওইদিন বরিশালের স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। বরিশাল মুসলিম ছাত্রলীগ এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ছাত্র ফেডারেশন তাদের সমর্থন দেয়। ছাত্রলীগের কাজী বাহাউদ্দীন আহমেদ আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে বরিশালের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১১ মার্চ হরতালের পর সভা করার জন্য কোথাও জায়গা পাওয়া যায় নি। তখন বরিশাল শহরে ফকিরবাড়ি রাস্তার পাশে সদর রোড দীপালি (অভিরুচি) সিনেমা হলের সামনে এবং আর্য্যলক্ষ্মী ব্যাংক সংলগ্ন কুচক্ষেতে সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কাজী বাহাউদ্দীন আহমেদ এবং বক্তব্য রাখেন ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল হক চৌধুরী (সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সভাপতি), এ.বি.এম আবদুল লতিফ (অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), মোহাম্মদ আর্শেদ (ভোলা), মোখলেছুর রহমান, আশরাফ আলী খান, হাসান ইমাম চৌধুরী প্রমুখ। জনসভার ছবি তোলেন ফখরুল ইসলাম খান। ওইদিন সন্ধ্যার পর পুলিশ কাজী বাহাউদ্দীন আহমেদ, শামসুল হক চৌধুরী, আঃ রশিদ, মোহাম্মদ আর্শেদ ও বি.এম. আশরাফ আলী খানকে গ্রেপ্তার করে কোতয়ালী থানায় নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা থানা ঘিরে ফেলে। পরে বাধ্য হয়ে প্রশাসন বন্দিদের মুক্তি দেয়।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এক জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে এর প্রতিবাদে বিভিন্ন দলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসমূহের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ২৮ সদস্যবিশিষ্ট ওই কর্মপরিষদের ৫ জন ছিলেন বৃহত্তর বরিশাল জেলার। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ২৬ জানুয়ারির ঘোষণার উত্তাপ বরিশালেও অনুভূত হয়। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বানে বরিশালে ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ পালনের প্রস্তুতি চলে। আওয়ামী মুসলিমলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে ১১ ফেব্রুয়ারি হতে অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘পতাকাদিবস’ পালন শুরু হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এ নামে পতাকা ও ব্যাজ বিতরণ এবং পোস্টারিং চলতে থাকে। কর্মীরা টিনের চোঙা নিয়ে রাস্তায় প্রচারকাজ চালান। ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল মালেক খানকে সভাপতি এবং যুবলীগের সম্পাদক আবুল হাশেমকে আহ্বায়ক করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট ‘বরিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। বরিশাল যুবলীগের সভাপতি আলী আশরাফ ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের নেতা।
বরিশালে ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে বি.এম কলেজের ছাত্রবৃন্দ ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তারা পৃথক ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন।

এর আহ্বায়ক ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি এবং বি.এম কলেজ ছাত্রসংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া (গৌরনদী)। সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন ছাত্রলীগ সম্পাদক এ.কে.এম. বেলায়েত হোসেন (শ্রমিক নেতা), সহসভাপতি মতিউর রহমান (যুগ্ম সম্পাদক), গোলাম রব্বানী (ট্রেজারার), রফিকুল ইসলাম (১৯৭১ সালে শহীদ), অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান, মোহাম্মদ ইউসুফ কালু, কলেজ সংসদের সম্পাদক আবদুস সাত্তার, সমীর পাল, জসিম বিশ্বাস, সরদার গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ।

২১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালে সকল বিদ্যালয় কলেজ ও শহরে হরতাল পালিত হয়। মিছিল বরিশাল শহর প্রদক্ষিণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার সংবাদ বরিশালে পৌঁছলে একজন পুলিশ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে তা জানান। ফলে পরিষদের উদ্যোগে রাত ৯টায় বরিশাল শহরে মিছিল বের করে। ওই রাতেই সার্কিট হাউসের নিকট অবস্থিত মুসলিম ইনস্টিটিউটে সংগ্রাম পরিষদের সভা বসে এবং পরবর্তীতে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসংখ্যা ২৫ হতে ৮১ জনে উন্নীত করা হয়।

‘বরিশাল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’র অন্তর্ভূক্ত যারা ছিলেন তাদের কয়েকজন হলেন- আবদুল মালেক খান (তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের জেলা সভাপতি), আবুল হাশেম (যুবলীগ আহ্বায়ক), আলী আশরাফ (যুবলীগ সদস্য), আবদুল আজিজ তালুকদার, অ্যাডভোকেট আবদুর রব সেরনিয়াবাত, প্রাণকুমার সেন, জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর, আবদুল করিম, সিরাজুল হক ভূঁইয়া (নয়া মিয়া), উকিল ওবায়দুল হক, উকিল আমিনুল হক চৌধুরী (সম্পাদক, আওয়ামী মুসলিম লীগ), ডা. হাবিবুর রহমান, ইমাদুল্লাহ (লালা ভাই), সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, মিসেস হামিদ উদ্দিন, মোশারেফ হোসেন মোচন, আলতাফ মাহমুদ (শহীদ), মোহাম্মদ হোসেন আলী, সরদার গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ আজিজুল হক শাহজাহান, সুনীল গুপ্ত, মোহাম্মদ ইউসুফ কালু, সাধন রায় চৌধুরী, সুলতান মিয়া, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, মুজিবুর রহমান কাঞ্চন (শহীদ), নসরুল্লাহ খসরু, আবদুস সাত্তার, বরুণ বর্মণ, হাজি আবদুল লতিফ খান প্রমুখ।

২১ ফেব্রুয়ারি সারা রাতেই ছাত্রদের প্রচার কাজ চলে। ঢাকায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে হরতাল ও মিছিল হয়। অন্যান্য জায়গায় মতো বরিশালেও আন্দোলনকে সংগঠিত করার চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। প্রায় পাঁচশ ছাত্রের এক মিছিল ক্লাস বর্জন করে বেরিয়ে পড়ে বরিশাল এ.কে. স্কুল থেকে। এর সংগঠক হিসেবে ছিলেন স্কুলের জেনারেল ক্যাপ্টেন এ.কে.এম. আজহার উদ্দীন (বর্তমান বরিশাল শহরের দক্ষিণ আলেকান্দা ‘রুমীবাগের’ বাসিন্দা এবং বরিশাল কিশোর মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা)। এছাড়া নবম শ্রেণীর ক্লাস ক্যাপ্টেন এ বারেক খলিফা, মীর আশ্রাফ উদ্দিন প্রমুখ আন্দোলন সংগঠনে ভুমিকা রাখেন। এ.কে. স্কুল ময়দানে ভাষা শহীদদের উদ্দেশে গায়েবানা জানাজা পড়ান মৌলভি সুলতান আহমেদ। জানাজা শেষে ছাত্র-জনতা মিছিল সহকারে শহরের রাস্তা প্রদক্ষিণ করে স্থানীয় অশ্বিনী কুমার হলচত্বরে সমবেত হন। সেখানে এ.কে.এম. আজহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।

২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা হতে স্টিমারে আগত সৈয়দ শামসুল হুদা একটি টেলিগ্রাম সংবাদপত্র নিয়ে আসেন, যাতে ঢাকায় ছাত্রহত্যার সংবাদ ছিল। অশ্বিনী কুমার হলের সামনে ভোর হতে ছাত্র-জনতার স্রোত নামে। গ্রাম হতে আগত জনতা ছাড়াও শহরের শত শত মহিলা মিসেস হামিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে এ শোভাযাত্রা করেন। বরিশালের অন্যান্য মহিলা ভাষা সৈনিক হলেনÑ হোসনে আরা নিরু, মঞ্জুশ্রী, মাহে নূর বেগম, রানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মেয়েরা, তারপরে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ। স্মরণকালের বৃহত্তম মৌনমিছিল অশ্বিনী কুমার হল হতে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে সার্কিট হাউস ময়দানে (১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ স্থানে বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন করেন) শেষ হয়। অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী খান বাহাদুর হাশেম আলী খান, অ্যাডভোকেট শামসের আলী প্রমুখ নগ্নপদে মৌনমিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ওইদিন অনেক মুসলিম লীগ নেতাকর্মি দল ত্যাগ করেন। সংগ্রামী জনতার এক জনসভা ওইদিন বিকেল ৪ টায় অশ্বিনী কুমার হলে অনুষ্ঠিত হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় এ.কে. স্কুল মাঠে শহীদ ছাত্রদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন অশ্বিনী কুমার হলের সামনে শহীদমিনার নির্মাণ করা হয়। এক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন আবুল হাশেম, জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর, চকবাজারের সুলতান, মোশারেফ হোসেন নান্নু, আলী আশরাফ, মোশারেফ হোসেন মোচন প্রমুখ। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদমিনারে শোকের প্রতীক কালোপতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর আগে মোহাম্মদ সুলতান তার দোকানের ১০ গজ সাদাকাপড় দিয়ে শহীদমিনার মুড়ে দেন। পুষ্পমাল্য দিয়ে আবুল হাশেম শহীদমিনার উদ্বোধন করেন। অবশ্য ২৭ তারিখে রাতের অন্ধকারে সরকারি নির্দেশে পুলিশ শহীদমিনারটি ভেঙে ফেলে।

বরিশাল শহরের বাইরেও অনেক স্থানে বিক্ষোভ মিছিল হয়। তার মধ্যে বানারীপাড়া উল্লেখযোগ্য। এখানে যারা আন্দোলনকে সংগঠিত করেন তাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীরা হলেন- আবদুশ শহীদ, অতুল ভট্টাচার্য, কালাচাঁদ বসু প্রমুখ। বানারীপাড়ায় ভাষার সংগ্রামে তাদের নেতৃত্বে উজ্জীবিত হন ছাত্ররা। বিশেষত জিন্নাহ স্কুল, খলিসাকোটা হাইস্কুল, চাখার কলেজ, নারায়ণপুর সরকারি হাইস্কুল, জাতীয় বিদ্যালয় প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা আন্দোলনে অংশ নেন। তারা মিছিল করে বানারীপাড়া প্রদক্ষিণ করেন। পরে থানার সম্মুখ দিয়েও যায় মিছিলটি। তবে গ্রেপ্তারের হুমকির ফলে আবদুশ শহীদ ও অতুল ভট্টাচার্য তখন মিছিলে ছিলেন না।

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের এই মিছিল প্রমাণ করে যে, ভাষা আন্দোলনের ঢেউ কতখানি লেগেছিল বাঙালির হৃদয়ে। পরে সংগঠকদের দৃঢ়প্রত্যয়ী ভাষণের পর মিছিলের পরিসমাপ্তি ঘটে।
ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনকারীদের কয়েকজন বৃহত্তর বরিশালের সন্তান। ১৯৫২ সালের ২৬জানুয়ারি গঠিত ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’-এ বৃহত্তর বরিশালে পাঁচজন সদস্য ছিলেন। তারা হলেন- কাজী গোলাম মাহবুব (আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধি), শামসুল আলম (ভিপি, ফজলুল হক মুসলিম হল), শামসুল হক চৌধুরী (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ), আখতার উদ্দিন আহমেদ (নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ) ও মুহাম্মদ মুজিবুল হক (ভিপি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল)। তারা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানাভাবে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ ইত্যাদি) অধ্যয়নরত বৃহত্তর বরিশালের ছাত্র-ছাত্রীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

২১ ফেব্রুয়ারির সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করেছেন বৃহত্তর বরিশালের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-শিল্পীরা। একুশের বিখ্যাত গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি রচনা করেছেন বরিশালের সন্তান জগন্নাথ কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী। গানটির প্রথম সুরকার আবদুল লতিফ এবং বর্তমান সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের জন্মও বরিশালে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী… গানটির সুর তোলা হয়েছিল বরিশাল নগরীর কালিবাড়ি রোডের শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের একটি কাঠের দোতলায় বসে। ওই সময়ে আলতাফ মাহমুদের সাথে ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ নারায়ণ সাহা। এছাড়া অমর গানটি ৫৩’র ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বরিশালেই প্রথম গাওয়া হয়। একুশের স্মরণে আবদুল লতিফ ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে রচনা করলেন ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়। একুশের উপর বিখ্যাত কবিতা কোন এক মাকে লিখেছেন বরিশালের কবি আবু জাফর মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ।

বরিশালের শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন এবং শহিদমিনার নির্মাণ ও বাংলা ভাষাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। বরিশালের সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এ সকল গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনাই বাঙালি জাতির মুক্তির পথপ্রদর্শক। একুশের চেতনাতেই ৫৪, ৫৬, ৬২, ৬৯ এবং ৭০-এর পথ ধরে ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ১৯শে পৌষ/ ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরিশাল কেন্দ্রিয় শহিদমিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বরিশাল কেন্দ্রীয় শহিদমিনার তৈিির করা হয়। যা আজ পর্যন্ত বরিশালের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের পীঠস্থান হিসেবে প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী
প্রভাষক, অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়, বরিশাল

তথ্যসুত্র :
রতন লাল চক্রবর্তী (সম্পাদক), ভাষা আন্দোলনের দলিল পত্র, বাংলা একাডেমী।
আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস, বাংলা একাডেমী।
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন (সম্পাদক), বাকেরগঞ্জ জেলার ইতিহাস, জেলা প্রশাসন, বরিশাল।

 



সর্বশেষ সংবাদ