• জাতীয়
  • »
  • বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার ধৃষ্টতা!

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার ধৃষ্টতা!

NewsBarisal.com

প্রকাশ : নভেম্বর ২৯, ২০২০, ৮:২৯ অপরাহ্ণ

আহমেদ জালাল : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার ধৃষ্টতায় দেখানোয় ক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি ২৮ নভেম্বর শনিবার ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর চরমোনাই পীর সৈয়দ ফয়জুল করীম ও হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের ফের আল্টিমেটাম দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বলছেন,“বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্য আর মূর্তি এক জিনিস নয়। ভাস্কর্য ও মূর্তির পার্থক্য বুঝতে হবে। এই পার্থক্য কাঠামোগত নয়, এটা চেতনাগত। চেতনার মাধ্যমে মূর্তির আরাধনা করা হয়। অন্যদিকে একটি ভাস্কর্য জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতীক।”“বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিছক ভাস্কর্য নয়, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য গোটা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি,বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিচ্ছবি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য আমাদের লাল-সবুজের প্রতিচ্ছবি। “বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে তারা আমাদের অস্তিত্বে আঘাত করেছে। গর্তের ভেতর থেকে তারা আস্ফালন করছে। “স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৫০ বছর পরও আজকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দেখতে হয়। বক্তারা বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তির বীজ আমরা আজও দেখতে পাই। যেই দেশের জন্য বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, চার হাজার ছয়শ বিরাশি দিন কারাবরণ করেছেন, সেই্ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার ধৃষ্টতা দেখায়! ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সমাবেশের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশ হেফাজত ইসলামীর আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীর ভাস্কর্য-বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। এই ইস্যুতে এতদিন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও ২৮ নভেম্বর শনিবার দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেন।
এদিকে,ঢাকার ধোলাইপাড় চত্বরে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য তৈরি করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছিল অনেকগুলো ইসলামপন্থী দল। তবে হেফাজতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা শনিবারই প্রথমবারের মত কড়া ভাষায় নিজের ভাস্কর্য-বিরোধী অবস্থান পরিস্কার করেন। শুক্রবার চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর তার বক্তব্যে বলেন, যে কোনো ‘ভাস্কর্য তৈরি করা হলে তা টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলা হবে।’ হেফাজতে ইসলামীর শীর্ষ নেতার এমন মন্তব্যের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ঐ মন্তব্যের প্রতিবাদ করে বক্তব্য দিয়েছেন। শনিবার সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জুনায়েদ বাবুনগরীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্তব্য করেন যে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ‘টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলবে বলে কোনো কোনো ধর্মীয় নেতা ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়ে একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অনভিপ্রেত ও উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এদেশের আবহমানকালের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি।” “তারা ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মপ্রিয় মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরির চেষ্টা করছে।” আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ জুনায়েদ বাবুনগরীর বক্তব্যকে ‘উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ ছড়ানোর অপচেষ্টা’ হিসেবে বিবৃত করেছেন। তিনি বলেন, “সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান সহ বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে ভাস্কর্য হতে পারবে না কেন?” “এই ধরণের উগ্রবাদী, জঙ্গিবাদী কথাবার্তা বলে তারা ইসলামের মত শান্তির ধর্মকে মানুষের কাছে বিতর্কিত করে তুলছে এবং মূর্খের মত উন্মাদনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকার বা জনগণ কেউই এটি বরদাস্ত করবে না।”
অপরদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ফয়জুল করিম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেপ্তার দাবিতে ২৪ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। শনিবার (২৮ নভেম্বর) বিকাল ৪টায় তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন।মঞ্চের নেতাকর্মীরা মামুনুল হক ও ফয়জুল করীমকে গ্রেফতারের দাবি করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, মহানবী (সা.) ও বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার অপরাধে আজ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে ধর্ম ব্যবসায়ী মামুনুল হক ও ফয়জুল করীমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলো মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার না করলে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ সারাদেশে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবে।
বলাবাহুল্য : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের হুমকির প্রতিবাদে এর আগে ১৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সমাবেশ থেকে মামুনুলের গ্রেপ্তার দাবিতে ৭২ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল সংগঠনটি। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে প্রথমে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করা হয়। সমাবেশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নেতাকর্মী জড়ো হন। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আল মামুন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা হয়েছে। একাত্তরের পরাজিত অপশক্তির দোসররাই তৌহিদী জনতার ব্যানারে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র চলমান রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ৭ দফা দাবি: # জাতির পিতাকে অবমাননা করার অপরাধে ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’ মামুনুল হক ও ফয়জুল করীমকে গ্রেপ্তার করতে হবে। # দেশের প্রতিটি বিশ্বিবদ্যালয়, কলেজ ও জেলা, উপজেলায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হবে। # সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। # বিভিন্ন ধর্মীয় সভা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উসকানিমূলক গুজব ছড়ানো ও অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। # ধর্ষণের ন্যায় বলাৎকারের অপরাধে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। # মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়ন বন্ধে মনিটরিং সেল গঠন করে নজরদারি বাড়াতে হবে। # মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত জাতীয় সংগীত বাজানো, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শহীদ মিনার নির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। আসুন আমরা এই মৌলবাদী অপশক্তিকে রুখে দাঁড়াই।”
প্রসঙ্গত : রাজধানীর ধোলাইপাড় চত্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই ইসলামপন্থী কয়েকটি দল প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করে আসলেও বিষয়টি আলোচনায় আসে ১৩ই নভেম্বর ঢাকায় একটি সম্মেলনে খেলাফত মজলিশের শীর্ষ নেতার বক্তব্যের পর। সেসময় তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সরে না দাঁড়ালে তিনি আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটাবেন এবং ওই ভাস্কর্য ছুঁড়ে ফেলবেন। তার ওই বক্তব্য সরকারি দল আওয়ামী লীগে অস্বস্তি তৈরি করে। এরপর অন্যান্য ইসলামপন্থী সংগঠনও শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্য দেন।
এরইধারাবাহিকতায় ২৭ নভেম্বর শুক্রবার জুমার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর চরমোনাই পীর সৈয়দ ফয়জুল করীম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের অনুসারী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জাতীয় বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। রমনা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহিরুল ইসলাম বলেন, জুমার নামাজের পর হঠাৎ ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একটি মিছিল বের করেন। আমরা থামিয়ে তাদের দাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা সে বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেন। পরে আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিই। এছাড়া ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে ঝালকাঠির নেছারাবাদে পীর-মাশায়েখ-ওলামাদেরকে বিষোদগারের প্রতিরোধে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১১ টায় নেছারাবাদ এন.সি.সি ভবনে আমীরুল মুছলিহীন হযরত মাওলানা খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিযবুল্লাহ জমিয়াতুল মুছলিহীনের সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ আযীযাবাদী, ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হযরত মাওলানা গাজী মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, মাদ্রাসার ফকীহ্ হযরত মাওলানা মুফতি আবদুল কাদের মাদানী, মুফাসসির হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবু হানিফ, কুতুব নগর আযীযীয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান প্রমুখ। বক্তারা ভাস্কর্য নির্মাণ ও আলেম ওলামাদেরকে বিষোদগার করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান। দেশে ভাস্কর্যসহ নির্মাণসহ ইসলাম বিরোধী সকল কার্যক্রম প্রতিহত করার ঘোষণা করেন এবং সরকারকে অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান।
———–
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান, ৭১’র মুখপত্র ‘ দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ’।

 



সর্বশেষ সংবাদ