শিশুরাই গড়ে তুলবে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ

NewsBarisal.com

প্রকাশ : অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১১:০৯ অপরাহ্ণ

এম.কে রানা : ‘আজকের শিশু আনবে আলো, বিশ্বটাকে রাখবে ভালো’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশব্যাপী আজ থেকে শুরু হচ্ছে শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০১৯। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার পালিত হয় বিশ্ব শিশু দিবস। দিবসটি ঘিরে প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত হয় নানান কর্মসূচি। তবে শহরে বসবাস করা শিশুরা নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ব শিশু দিবস উদযাপনের সুযোগ পেলেও দেশের বৃহত্তর অংশের শিশুরা দিনটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারা শিক্ষার আলো থেকে হয়ে আছে বঞ্চিত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং কিছু কিছু বে-সরকারী সংস্থা শিশু অধিকার সুরক্ষা, শিশুশ্রম নিরসন, শিশুদের মতামতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান সহ শিশু বিষয়ক বিভিন্ন কর্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে শিশু অধিকার রক্ষায় শিশুদের সার্বিক বিকাশের নিমিত্তে তাদের সফল ও সার্থক ভবিষ্যৎ বিনির্মানে প্রয়োজনের তুলনায় এ কার্যক্রম অত্যন্ত অপ্রতুল।

এছাড়া অনেক শিশুরই যদিও বা একটু-আধটু পাঠশালা-স্কুল-মাদরাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো, তারাও দারিদ্র্যের কষাঘাতে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে জীবিকার তাগিদে কাজে নামতে বাধ্য হয়েছে। যে বয়সে তাদের হাতে স্কুল-মাদরাসার বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সে কেউ রিকশা চালাচ্ছে, কেউ কাগজ কুড়াচ্ছে, কেউ ইট পাথর ভাঙ্গছে আবার কেউ বাসের হেলপার হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এমনিভাবে আমাদের দেশে শিশুশ্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ দারিদ্র। দারিদ্র দূর করতে না পারলে শিশুশ্রম বন্ধ হবে না। একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই এ শিশুদের জীবনে বিকাশ এবং শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব। তাছাড়া তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যত্ন, বিকাশ ও সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় সমাজের বিত্তবান সহ সর্বস্তরের মানুষ কে স্ব স্ব অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিশুরা ফুলের মত পবিত্র ও নিষ্পাপ। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত। এ শিশুরাই গড়ে তুলবে আগামীর সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। পৃথিবীর হাসি-গান-আনন্দের নিরন্তর উৎস হলো তারা। আজকের শিশুরাই আগামীর স্বপ্নময় ভবিষ্যতের দিশারী। এদের মধ্যে কেউ হবে বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাষ্ট্রনায়ক প্রভৃতি। আবার কেউ ঝরে যাবে ভবিষ্যতের ক্রুর, বৈরী পৃথিবীর ক্ষুধা দরিদ্র, পুষ্টিহীনতা, নিরাপত্তাহীনতার আবর্তে।

সূত্রমতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। অনেক শিশু অনাথ-এতিম হয়ে পড়ে। এইসব অনাথ নিরীহ শিশু সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তার উন্মেষ ঘটার পর ১৯২৪ সালে জাতিপুঞ্জ ঘোষণা দেয় ‘মানব জাতির সর্বোত্তম যা কিছু দেয়ার আছে, শিশুরাই তা পাবার যোগ্য।’ কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়, শিশুদের সমস্যার সমাধান হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এবারও লক্ষ লক্ষ শিশু অসহায়, অনাথ, এতিম হয়ে পড়ে। আবারও তারা মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪০ সালে শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আসে জেনেভা ঘোষণা।

এরপর ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ভিয়েনাতে জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি উলে¬খযোগ্য বিষয়। এরই আলোকে ২০ নভেম্বর, ১৯৮৯ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ম ও সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করা হয়। অবশ্য ইতিপূর্বে ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক শিশু কল্যাণ ইউনিয়ন বিশ্ববাসীর দৃষ্টিকে সুদূরপ্রসারী ও জাগ্রত করার জন্যে একটি নির্দিষ্ট দিনে একটি শিশু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব আনে। ১৯৫৩ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার উদযাপিত হয় প্রথম বিশ্ব শিশু দিবস। ৪০টি দেশ প্রথম বিশ্ব শিশু দিবস পালন করে।

এরপর ১৯৫৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যদের উদ্যোগে শিশুদের বিভিন্নমুখী উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এর ফলে বিশ্বের সকল দেশের শিশুদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিশুদের প্রতি বিবেকমান সহৃদয়বান মানুষের সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়। পাঁচ বছর পর পুনরায় ১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় শিশুদের জন্য ১০টি অধিকার, যা বিশ্বের সব শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো বর্ণবৈষম্যের প্রভাবমুক্ত অধিকারগুলি হলো-

১. জাতি, ধর্ম, বর্ণ অথবা জাতীয়তা নির্বিশেষে শিশুরা অধিকার ভোগ করবে।

২. স্বাধীন, মুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশে শিশুরা বিশেষ নিরাপত্তা ও অবাধ সুযোগ ভোগ করবে।

৩. জন্মসূত্রে প্রতিটি শিশুর একটি নাম ও জাতীয় পরিচয় থাকবে।

৪. আবাসিক সুবিধা, প্রচুর পুষ্টি, বিনোদন ও স্বাস্থ্য পরিচর্যাসহ সামাজিক সুবিধা থাকবে।

৫. পঙ্গু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের শুশ্রুষা, শিক্ষা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. যতদূর সম্ভব মা-বাবার আশ্রয়ে ও তত্ত¡াবধানে প্রীতি ও সমঝোতা এবং নিরাপত্তার স্নেহময় পরিবেশে শিশু থাকবে।

৭. স্বকীয় সত্তা বিকাশে সমান সুযোগ এবং বিনা ব্যায়ে শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. দুর্যোগের সময় শিশু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপত্তা ও ত্রাণ পাবে।

৯. অবজ্ঞা, নিষ্ঠুরতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে হবে।

১০. ধর্ম বর্ণ বা অন্য যেকোনো ধরনের বৈষম্য থেকে নিরাপত্তা এবং শান্তি ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের পরিবেশে শিশুকে গড়ে তুলতে হবে।

শিশু অধিকার ঘোষণার পর ১৯৮৯ সালে সারা বিশ্বে বিশেষ শিশু বর্ষ উদযাপিত হয়। ১৯৮৯ সালে পুনরায় জাতিসংঘে শিশু অধিকার সম্পর্কে বিশ্ব রাষ্ট্র প্রধানরা একত্রিত হয়ে আলোচনায় মিলিত হন। মতৈক্য হয় নতুন শিশু অধিকার সনদ তৈরি করার প্রতি। এই সনদে ৫৪টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সব ধারাতেই কিছু নির্দিষ্ট সুফল ভোগ করার ও কিছু ক্ষতিকর দিক থেকে রক্ষা পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই ৫৪টি ধারার মধ্যে ৪১টি ধারাই শিশুদের অধিকার বিষয়ে। শিশু অধিকারগুচ্ছকে প্রধানত আবার পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

যেমন: ১. বেঁচে থাকা। এর মধ্যে পড়ে জীবন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অধিকার।

২. বিকাশ-এর মধ্যে পড়ে শিক্ষা, শিশুর বিকাশের জন্য জীবনযাত্রারর মান, অবসর ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরর অধিকার।

৩. সুরক্ষার মধ্যে পড়ে নির্যাতন ও অবহেলা থেকে সুরক্ষা, উদ্বাস্তু শিশুর রক্ষা ও পরিবারহীন শিশুর সুরক্ষার অধিকার।

৪. অংশগ্রহণের মধ্যে পড়ে মতামত বিবেচনায় নেয়ার অধিকার। মতো প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মেলামেশার স্বাধীনতা।

৫. বাস্তবায়ন ও সচেতনতার মধ্যে পড়ে অধিকার বাস্তবায়ন, সনদ সম্পর্কে সচেতনতা এবং তা বাস্তবায়ন সম্পর্কে অবগত করা। কিন্তু আজও শিশুদের অধিকার পুরো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। শিশুরা পাচ্ছে না তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ।

তবে এক্ষেত্রে আমাদের একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে, শিশুটি যে উদ্দেশ্যে শ্রম দিচ্ছে সেটি মেটানো। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বেশিরভাগ শিশুই খাদ্যের বিনিময়ে কাজ করছে বা অন্নসংস্থানের উপায় হিসেবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে যদি শিশুদের সংঘটিত করা যায়, তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যায়, তাহলেই শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা যাবে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, শিশুশ্রম রোধ একদিনে সম্ভব নয়। কারণ বিষয়টির সঙ্গে জীবনধারণের প্রয়োজন জড়িত রয়েছে। তাই বল প্রয়োগ করে শিশুশ্রম বন্ধ করলে শিশুর ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।

এক্ষেত্রে সমাজের সবার উচিত, মানবিক দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে আসা। শিশুদের শ্রমের ক্ষেত্রে কিছু শর্তারোপ করা প্রয়োজন। একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, দিনের বিশেষ একসময়ে শিশুকে পড়ার সুযোগ দিতে হবে। সেটা শিশুর জীবনের উন্নয়নের জন্য যেমন প্রয়োজন, ঠিক সমাজের সার্বিক কল্যাণেও অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে ওঠে দক্ষ জনশক্তি। আমাদের আজকের শিশুকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে চাই, তাহলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সব ধরনের সামাজিক অসামঞ্জস্যতা দূর করে সকল শিশুকে সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

 



সর্বশেষ সংবাদ
পটুয়াখালীতে মোবাইলে ভয়ভীতি দেখানোয় নারী ভাইস চেয়ারম্যানের জিডি পিটিয়ে জখম, মুলাদীর একজনকে ৫ বছরের কারাদন্ড মুলাদিতে দুই মাদক কারবারিকে ৩ বছর করে কারাদন্ড মেহেন্দিগঞ্জে যুবতীকে ধর্ষণ শেষে হত্যার চেষ্টা, মামলা দায়ের নাজিরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আজীবন দাতা সদস্য ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকে বাদ দিয়ে তফসিল ঘোষণা, মামলা রিফাত হত্যা: তোকে ভুলতে পারি নারে ভাইয়া, রিফাতের বোন প্রতিবন্ধিকে জমি থেকে উৎখাতের পায়তারা, ফেঁসে যাচ্ছেন সার্ভেয়ার আল আমিন বরিশাল জেলা আ’লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত আগৈলঝাড়ায় পুত্রবধূ নির্যাতনের মামলায় শাশুড়ি গ্রেফতার কাঁঠালিয়ায় অটোবাইকের চাপায় শিশু নিহত
%d bloggers like this: