• এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার খাতা কেলেংকারীতে তোলপাড়

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার খাতা কেলেংকারীতে তোলপাড়

NewsBarisal.com

প্রকাশ : আগস্ট ১০, ২০১৯, ৭:৩৭ অপরাহ্ণ

১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত ॥ ১ কর্মচারী বহিস্কার ॥ পরীক্ষক ছিলেন মানিক মিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষক ॥ নজরদারীতে আরও ৪/৫জন ॥ গতবছর ১-৩ নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীও পেয়েছে ৫০ ॥ অভিভাবকদের সংবাদ সম্মেলন

জিয়া শাহীন ॥ গত বছর উচ্চতর গনিতে পেয়েছে কেউ ১ বা ২ অথবা ৩। এবার ৫০ এর মধ্যে ৫০। এরকম ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রের ১৮জন পরীক্ষার্থীর উচ্চতর গনিতে একই পরীক্ষকের কাছ থেকে একই নম্বর পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের সৃস্টি হয়। এ ঘটনায় শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রাখেন। শুরু হয় ব্যাপক তদন্ত। তদন্ত কমিটি ঐ ১৮ পরীক্ষার্থীকে বোর্ডে এনে এদের দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আর তদন্তে যা মিলেছে তা নিয়ে শিক্ষা বোর্ড জুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। বের হয়ে আসে বেশ কয়েকজন বোর্ড কর্মচারীর নাম। একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। নজরদারিতে রয়েছে আরও ৪/৫জন। অপর দিকে ফলাফল প্রকাশের দাবিতে স্থগিত হওয়া ১৮ শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা গতকাল বরিশাল আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তারা জানান ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা এই ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল আটকে রাখায় তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পরেছে। এসময় তারা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফলাফল আটকে রাখাসহ তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের নামে এক পরীক্ষার্থীকে কক্ষের মধ্যে আটকে মারধরের অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।
জানা গেছে ২০১৯ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফলাফল প্রকাশের সময় বিভিন্ন কেন্দ্রের ১৮ পরীক্ষার্থীর একই নম্বর পাওয়ার বিষয়টি প্রথমে কম্পিউটার বিভাগের নজরে আসে। ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রের ১৮ পরীক্ষার্থীর খাতা নির্দিষ্ট একজন শিক্ষকের কাছে কিভাবে এল সে রহস্য খুজতে গিয়ে বেড়িয়ে পড়ে সাপ। এই ১৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪জন ২০১৮ সালে উচ্চতর গনিতে ফেল করে। এদের মধ্যে কেউ পেয়েছিল ১ কেউবা ২ বা ৩। এবার তারা ৫০এর মধ্যে ৫০ পাওয়ায় সন্দেহ আরও জটিল হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন কেন্দ্রের ১৮ পরীক্ষার্থীর খাতা একজন নির্দিষ্ট পরীক্ষকের কাছে কিভাবে গেল তা নিয়েই বোর্ড তোলপাড় শুরু হয়।
তদন্ত কারীরে কাছে বিষয়টি পরিস্কার হয় ১৮জন বিভিন্ন কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের খাতা বোর্ডের কোন কর্মচারী বা কর্মকর্তা এক করে একজন নির্দিষ্ট শিক্ষক দ্বারা দেখানো হয়। বিষয়টি আরও পরিস্কার হয় যখন ঐ পরীক্ষা খাতাগুলোর পিছনে একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন পাওয়ায়। জানা গেছে এ খাতাগুলো দেখেন বরিশাল তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মহিলা কলেজের গনিত বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক মনি শংকর। তাকে জ্ঞিাসাবাদ করে তেমন কিছু মেলেনি। কেননা তিনি দাবি করেন খাতায় যা পেয়েছেন সেভাইে তিনি নম্বর দিয়েছেন। এরপর বেরিয়ে আসে পিলে চমকে যাবার মত ঘটনা। শিক্ষার্থীদের ডেকে একটি অংক করতে দেয়া হলেও তারা তা পারেনি। অথচ এরা ৫০ এর মধ্যে ৫০ পেয়েছে। পরীক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং গোপন তদন্তে জানা যায় বিশেষ চিহ্ন দেয়া ঐ খাতাগুলো নমুনা উত্তর সহ পরীক্ষার্থীদের কাছে আবারও সরবরাহ করা হয়। তারপর সেই খাতাগুলো একসাথে এক বান্ডিলে পরীক্ষকের কাছে দেয়া হয়। এ পুরো ঘটনাটি নিয়ে হতবাক হয়ে পড়েন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তারা সন্দেহ করছেন এ চক্রটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ ধরনের জালিয়াতি কাজের সাথে জড়িত রয়েছে।
বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ ইউনুচও জানান এটি বোর্ডের কারো সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন । তিনি জানান, ঐ ১৮জনের খাতার বিশেষ চিহ্নও তারা দেখতে পেয়েছেন। তাই এদের ফলাফল স্থগিত রেখে শুরু হয় তদন্ত। এতে একজন কর্মচারীর নাম উঠে আসে। গোবিন্দ নামের ঐ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। তবে চক্রের সাথে আরও ৪/৫জন জড়িত বলে তারা মনে করছেন।

এদিকে ১৮ পরীক্ষার্থীর অভিভাবকদের পক্ষে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অভিভাবক মাহবুব আলম বলেন, ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই এইচএসসি (সেশন ২০১৭-১৮) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমাদের ১৮ জন সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়। এজন্য ফলাফল প্রকাশের আবেদন জানিয়ে গত ১৮ জুলাই বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৪ জুলাই বোর্ডের আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা পরবর্তী ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে আশ্বস্থ করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মোঃ আনোয়ারুল আজিম। কিন্তু সভা পরবর্তী ২৫ জুলাই বোর্ডের ওয়েবসাইটে ১৮ শিক্ষার্থীর ফলাফল পূর্বের ন্যায় স্থগিত দেখা যায়। এজন্য পুনরায় বোর্ডে যোগাযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ অস্বীকার করলে তাদেরকে বোর্ড চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি এবং হুমকি প্রদর্শন করেন। এমনকি তারা জোরপূর্বক বোর্ডের অফিস সহকারী গবিন্দ’র নাম বলতে বাধ্য করেন। তা না করলে ১৮ শিক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল করার হুমকি দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ফলাফল স্থগিত থাকা নুসরাত কবির নামের বরিশাল সরকারী মহিলা কলেজের এক ছাত্রীকে চেয়ারম্যানের বিশেষ কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। এছাড়াও ওই ছাত্রীকে অফিস সহকারী গবিন্দর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনে সহযোগিতা করার বিষয়ে জোরপূর্বক লিখিত রাখা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট স্থগিত রাখা ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও অদ্যবদি তা প্রকাশ করা হয়নি বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন।
তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, অভিভাকরা সংবাদ সম্মেলন এমনকি চাইলে আইনী সহায়তাও নিতে পারেন। কিন্তু আমরা বোর্ডের আইনের বাইরে যাবোনা। দুষ্ট চক্রের মূল উৎপাটন করে ছাড়বো। তিনি বলেন, যে ১৮ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা গুরুতর। তারা অসদুপায়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বিষয়ে অনেক তথ্য প্রমান আমাদের হাতে আছে। কেননা অপরাধী অপরাধ করে কোন না কোন চিহ্ন রেখেই যায়। ওই ১৮ শিক্ষার্থীর বেলায় একই হয়েছে।
তিনি বলেন, যে ১৮ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে তারা বরিশাল বিভাগের বিভিন্নস্থানের ১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু কাকতালিয়ভাবে ওই ১৮ জনের পরীক্ষার খাতাই যে কোন একজন পরীক্ষকের হাতে পৌঁছেছে। এটা বোর্ডের কারোর সহযোগিতা ছাড়া করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ১৮ জন পরীক্ষার্থীর উচ্চতর গণিত প্রথম পত্রের উত্তরপত্রের বিশেষ স্থানে একই ধরনের দাগ দেয়া রয়েছে। তাছাড়া প্রতিজনের খাতার সাথেই লুজ শিট রয়েছে। যা মুল উত্তরপত্রের সাথে পিনআপ বা রশি দিয়ে বাঁধা থাকবে। কিন্তু তেমনি করে পাওয়া যায়নি। লুজশিটগুলো আলাদা পাওয়া গেছে। এমনকি তাতে পিন মারা বা রশি দিয়ে আটকার কোন চিহ্নও নেই।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, উচ্চতর গণিতে পরীক্ষার্থীরা যে অংক করেছেন তার মধ্যে একটি অংক নুসরাত নামের এক ছাত্রীকে পুনরায় করে দিতে বলা হয়। যতটুকু পারে ততটুকু করতে বলা হয় তাকে। কিন্তু ওই শিক্ষার্থী তাও করে দেখাতে পারেনি। এ থেকে বোঝা যায় ওই অংক সে করতে পারেনি। সুতরাং এর পেছনে অন্য কারোর হাত থাকতেই পারে।
শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া বলেন, এটি স্রেফ গুজব। ওই মেয়েকে আমি মা বলে ডেকেছি। ওকে নিজের মেয়ে বলে সম্বোধন করেছি সত্য ঘটনা বের করার জন্য। ওর গায়ে হাত দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। মুলত এখন ষড়যন্ত্র চলছে। কোন ষড়যন্ত্রই অপরাধীদের বাঁচাতে পারবে না।
পাশাপাশি যে ১৮ শিক্ষার্থী অসদ উপায় অবলম্বন করে অপরাধের সাথে সামিল হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিধিমোতাবেক তাদের ওই পরীক্ষা বাতিলসহ আগামী ৩ বছরের জন্য পরীক্ষা থেকে বহিঃস্কারের বিধান রয়েছে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার চক্রের সদস্য বোর্ডের অফিস সহকারী গবিন্দকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন। সব মিলিয়ে ১৮ পরীক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন এখন চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে।

 



সর্বশেষ সংবাদ
%d bloggers like this: